সোমবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মানিক উপন্যাস নিয়ে কতিপয় লেখা


পুতুলনাচের ইতিকথা ও মানুষের নিয়তি

জীবনকে দেখার, বোঝার আর প্রকাশ করার ভঙ্গি মানিকের স্বতন্ত্র। যেন কোনো কিছুকেই এড়িয়ে যাওয়া তার চলে না। ঘটনার ডিটেইলস কিংবা অনুভবের গভীরতা তার উপন্যাসের প্রাণবস্তু। পুতুলনাচের ইতিকথায় নিয়তির অমোঘতা, মানব-জীবনের চালচিত্র ও বাস্তবতা আর যাপিত জীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের বিবরণে মানিক দারুণ কৌশলী। এই উপন্যাসটি পাঠের আনন্দ পাঠককে বহুকাল পর্যন্ত আলোড়িত করে, বিমুগ্ধ করে আর যেন অনবরত কী সব ভাবায়।


ড. ফজলুল হক সৈকত
সমাজ এবং সাহিত্যের মধ্যকার নিবিড় সম্পর্কের ব্যাপারটি বোধ করি কেউই অস্বীকার করতে পারেন না। সমাজ পরিবর্তনের নানা সূত্র ধরে পরিবর্তিত ও বিবর্তিত হয় সাহিত্যের রূপ ও মাধ্যম; তৈরি হয় নতুন নতুন ক্যানভাস এবং কাঠামো। সময় ও সমাজের বিবর্তনের এক বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে উপন্যাস সাহিত্যের জন্ম। নবতর উৎপাদনব্যবস্থা এবং সমাজ-রূপান্তর ও শ্রেণিবিন্যাসের ভাবনাস্তরে উপন্যাস-কাঠামোর আবির্ভাব। উপনিবেশ আমলে এ ভূখ-ে পুঁজিবাদী যে সমাজব্যবস্থার উদ্ভব ও বিকাশ, তারই বিস্তৃৃত পরিসরে আদর্শবাদের প্রচারক্ষেত্র হিসেবে একরকম উপন্যাসের সৃষ্টি। সে বিবেচনায় বাংলা উপন্যাসের অভিযাত্রার ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধে কিছু উপন্যাসধর্মী রচনা (যেমন ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নববাবু বিলাস ১৮২৩; হ্যানা ক্যাথরিন ম্যুলেন্সের ফুলমনি ও করুণার বিবরণ ১৮৫২; প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল ১৮৫৮ প্রভৃতি) বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের ভিত রচনা করলেও এ মাধ্যমের সৌকর্য সাধিত হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮_৯৪), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১_১৯৪১), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)_ তাদের হাতে। পরে তিন বন্দ্যোপাধ্যায় (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) এ ধারার বিকাশে মেধা-মনন ও শ্রম বিনিয়োগ করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (জন্ম: বিহার ১৯ মে ১৯০৮; মৃত্যু: কলকাতা ৩ ডিসেম্বর ১৯৫৬) সাহিত্য-বিহারে আবির্ভাব ও বিকাশপর্ব। তাই সে সময়ের অতি-রোমান্টিকতাবিরোধী সাহিত্য-আন্দোলন এবং নানা নিরীক্ষাধর্মিতা তার সাহিত্যচিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল স্বাভাবিকভাবেই। বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস-কাঠামো রচনার প্রায় শতবর্ষে এসে মানিক এ শিল্পের কাঠামো ও পরিবেশন-কায়দায় যে অভিনবত্ব আনলেন, তা আমাদের জন্য রীতিমতো বিস্ময়ের এবং আনন্দের ব্যাপার। সমাজ-বাস্তবতা, মানব-মনের দুর্জ্ঞেয় রহস্য উদঘাটন প্রচেষ্টার পাশাপাশি তার সাহিত্যে বিজ্ঞানমনস্কতা পাঠককে আকৃষ্ট করে অনায়াসে। তিনি তার পুতুলনাচের ইতিকথা (১৯৩৬) লেখার পরিপ্রেক্ষিত ও প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন:

লিখতে শুরু করেই আমার উপন্যাস লেখার দিকে ঝোঁক পড়ল। কয়েকটি গল্প লেখার পরই গ্রাম্য এক ডাক্তারকে নিয়ে আরেকটি গল্প ফাঁদতে বসে কল্পনায় ভিড় করে এলো 'পুতুলনাচের ইতিকথা'র উপকরণ এবং কয়েকদিনে একটা গল্প লেখার বদলে দীর্ঘদিন ধরে লিখলাম এই উপন্যাসটি। এ ব্যাপারের সঙ্গে সাধ করে বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ার সম্পর্ক অনেকদিন পর্যন্ত অনাবিস্কৃত থেকে যায়। মোটামুটি একটা ধারণা নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলাম যে সাহিত্যিকেরও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে বর্তমান যুগে, কারণ তাতে অধ্যাত্মবাদ ও ভাববাদের অনেক চোরা মোহের স্বরূপ চিনে সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়।

মানব-সম্পর্ক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প-কাহিনীর অনন্য উপাদান। তিনি মূলত মানবিক রীতিনীতি, টানাপড়েন, সংঘাত-পরিণাম আর সম্ভাবনারই চিত্র অাঁকেন জীবনের অভিজ্ঞতা আর কল্পনার আলোক রেখায়। তার সাহিত্যে ব্যক্তিজীবন নয়; মানবজীবনই চিত্রিত বহুলাংশে। অব্যাখ্যেয়-জটিল-বিষণ্ন আর ক্লান্ত জীবনের ক্যানভাস যেন তার কাহিনীতে গড়ে ওঠে। পুতুলনাচের ইতিকথায় সমাজ, মানুষ, মানুষের বিচিত্র প্রবণতা, প্রবৃত্তির নানান অনুষঙ্গ, জীবনের সঙ্কট, প্রেম-অনুভূতি, প্রকৃতি ও নির্মমতা এবং নিয়তির অমোঘতা চিত্রিত হয়েছে লেখকের ব্যক্তিগত অভিব্যক্তির অন্তরালে। তিনি জীবনকে সাজিয়েছেন জীবনেরই সাজে; কল্পনার আতিশয্যে নয়। গ্রাম আর নগরের বিভেদ, সভ্যতার দ্বন্দ্ব, প্রজন্মের স্বভাবজ সংঘাত, করুণা আর আভিজাত্যের নির্মম-নির্লজ্জ প্রকাশে এ উপন্যাস বিশেষ দিকচিহ্ন ধারণ করে। 

মেয়ের জন্য পাত্র দেখতে যাওয়ার পথে গাওদিয়া গ্রামে বজ্রাঘাতে হারু ঘোষের মৃত্যু হয়। মানুষের জীবনের শেষহীন সংগ্রামের পর্যায়গুলোর এই কী পরিণাম! প্রকৃতি কি মানুষের সার্বক্ষণিক প্রতিযোগী? মানুষ প্রকৃতিকে মেনে নিয়েছে কখনো, কখনো করেছে নিয়ন্ত্রণচেষ্টা। এরই মধ্যে ঘটে চলেছে নিয়তির বিচিত্র খেলা। উপন্যাসটির শুরু পাঠককে ভাবিয়ে তোলে নানানভাবে। লেখক চমৎকার বর্ণনার মধ্য দিয়ে শুরু করেছেন উপন্যাস যাত্রা:

খালের ধারে বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়া ছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন। হারুর মাথায় কাঁচা-পাকা চুল আর মুখে বসন্তের দাগভরা রুক্ষ চামড়া পুড়িয়া গেল। সে কিন্তু নিজে টের পাইল না। শতাব্দীর পুরাতন একটি মুখ অবচেতনার সঙ্গে একান্ন বছরের আত্মময়তায় গড়িয়া তোলা চিন্ময় জগৎটি তাহার চোখের পলকে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। কটাক্ষ করিয়া আকাশের দেবতা দিগন্ত কাঁপাইয়া এক হুংকার ছাড়িলেন। তারপর জোরে বৃষ্টি চাপিয়া আসিল।

পুতুলনাচের ইতিকথা সোজাসাপ্টা বাস্তব কাহিনীর বর্ণনা। গ্রামীণ সমাজের ঘেরাটোপে আটকে-পড়া অসহায় মানুষই এখানে বিবেচ্য। সমাজের চিত্র আর বাস্তবতা উপস্থাপনের জন্যই মানিক এখানে সাজিয়েছেন চরিত্রগুলোর প্রাসঙ্গিকতা ও বিস্তার। শশী ডাক্তারকে ঘিরেই আবর্তিত হয় গল্পের কাঠামো। মূলত মানব-জীবনের এক মহাদলিল এই উপন্যাস। সমাজের সংস্কার, প্রেক্ষিত-প্রাসঙ্গিকতা, দায়িত্ববোধ আর বিভ্রমের বেড়াজালে থমকে থাকা যে জীবন, তারই বিশ্বস্ত রূপায়ণ পুতুলনাচের ইতিকথা। শশী চরিত্রের প্রতীকে প্রকাশ ঘটে সেই মহাসত্যের। মানুষের অর্জিত কীর্তিরাশির নিরর্থকতাও এ গ্রন্থের আরেকটি অনুষঙ্গ। শহর থেকে ডাক্তার হয়ে আসা গ্রামের ছেলে শশী। ডাক্তার লড়াই করে রোগের সঙ্গে, মৃত্যুর সঙ্গে। অবশ্যই মৃত্যুকে নিঃশেষে জয় করা সাধ্য নয় কারো। তবু শরীর ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রকৃতির আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা ডাক্তারের দৈবযোগে নয়, বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টায়। মানুষ ও প্রকৃতির দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের সংগ্রামে অন্যতম মানুষিক সৈনিক ডাক্তার।
উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদেই একটি পুতুলের অস্তিত্ব প্রকাশ পায়। বকুল তলায় পড়ে-থাকা ন্যাকড়া-জড়ানো পুতুলটি যে শ্রীনাথের মেয়ের পুতুল, তা বুঝতে পারে ডাক্তার শশী। আর সে এও অনুভব করতে পারে যে, ভোর বেলায় গ্রামের মেয়েরা পুতুলটিকে দেবতা-প্রেরিত বলে ভেবে নেবে। বলা যায়, একরকমভাবেই ঔপন্যাসিক শশী এবং গ্রামবাসীর মধ্যকার পার্থক্যের সুতো বেঁধে দেন। গাওদিয়ার বাসিন্দারা অশিক্ষিত-সংস্কারাচ্ছন্ন, স্বাস্থ্য-সম্পর্কে অসচেতন আর মানসিক জড়তায় নিমগ্ন। এ গ্রামে শশীর সংগ্রাম শুধু ডাক্তার হিসেবে প্রকৃতির আক্রমণের বিপক্ষেই নয়; গ্রামের মানুষকে জাগ্রত করার দায়িত্বও যেন তার ওপর এসে পড়ে। প্রথমে অবশ্য সে গ্রামে এসে একপ্রকার বিব্রত ও অস্বস্তিতেই পড়েছিল। তার সেই অভিব্যক্তির প্রকাশ_ 'বাকি জীবনটা তাহাকে এখানেই কাটাইতে হইবে না কি? ও ভগবান, একটা লাইব্রেরি পর্যন্ত যে এখানে নাই!' শশীদের গ্রামের ভয়াবহতা যে কতটা করুণ ও নির্মম, তা বোঝা যায় ঔপন্যাসিকের বর্ণনা থেকে :
পুল পার হইয়া কিছুদূর পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে শুধু চষা ক্ষেত। তারপর গ্রাম শুরু হইয়াছে। এদিকে বসতি কম। রাস্তার দক্ষিণে ঝোপঝাড়ের বেষ্টনীর মধ্যে পৃথক কয়েকটা ভাঙাচোরা ঘর, বৃষ্টিতে ঘরে-বাইরে ভিজিয়াছে। ওখানে সাত ঘর বাগ্দী বাস করে। ... একটু পার হইয়া গেলে বসতি ঘন হইয়া আসে। বাড়িঘরের উন্নত অবস্থা চোখে পড়ে। পথের দুদিকেই দুটি-একটি শাখাপথ পাড়ার দিকে বাহির হইয়া যাইতে শুরু করিয়াছে দেখা যায়। মাঝেমধ্যে কলাবাগান, সুপারিবাগান ও ছোট ছোট বাঁশঝাড় ডাইনে-বায়ে আবির্ভূত হয়। আমবাগানকে অন্ধকার মনে হয় অরণ্য। কোনো কোনো বাড়ির সামনে কামিনী, গন্ধরাজ ও জবাফুলের বাগান করিবার ক্ষীণ চেষ্টা চোখে পড়ে। ক্রমে দু-একটি পাকা দালানের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। বাড়িগুলো আগাগোড়া দালান নয়, এক ভিটায় দুখানা ঘর হয়তো ইটের, বাকিগুলো ছনে ছাওয়া চাঁচের বেড়ায় গ্রামেরই চিরন্তন নিজস্ব নীড়।
এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে দারুণ-অকল্পনীয় সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়; যেন এক সুতোয় গাঁথা জীবন, আলাদা কিছু নয়। কারো কোনো স্বাতন্ত্র্য নেই, মৌলিকতা নেই। তাদের সবার সুখ-দুঃখ এক, অনুভূতি-আনন্দ অভিন্ন। ভয় ও সংস্কার এক, হীনতা ও উদারতায় এতটুকু পার্থক্য নেই যেন। সরকারের মুহুরি পঞ্চানন জমিদার, পেনশনপ্রাপ্ত হেড পিয়ন কীর্তি নিয়োগী, বাংলাস্কুলের মাস্টার শিবনারায়ণ_ পেশা পৃথক হলেও চিন্তা তাদের একই। এদের মধ্যে শুধু চোখে পড়ার মতো আলাদা চরিত্র যেন ভুজঙ্গধর আর যাদব প-িত। ভুজঙ্গ বছর ছয়েক জেল খাটার পর এখন তেমন কোনো সাড়া-শব্দ করে না। শুধু শ্রোতার ভূমিকায় অবতীর্ণ থাকে। তার চোখে গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত। আর যাদবকে_ ধার্মিক ও অলৌকিক শক্তির অধিকারী বলিয়া লোকেরা সম্মান করে একটু বেশি_ হয়তো ভয়ও কাজ করে কারো কারো মনে।
পুতুলনাচের ইতিকথায় মানিক গ্রামজীবনের বাস্তবতার সমগ্রতাকে ধরতে চেয়েছেন; সত্যাসত্য রূপায়ণে তিনি আরোপিত কোনো ধারণা নয়, গ্রাম নিবাসী নর-নারীর অন্তরের চিরন্তনতাকেই বিবেচ্য রেখেছেন। তাই মানিকের গাওদিয়া গ্রামবাসীরা যেন রবীন্দ্রনাথের গ্রামজীবনের সমূহ চরিত্র আর শরৎচন্দ্রের পল্লীচিত্রের পাত্র-পাত্রীর চেয়ে ভিন্নতর। যেন গাওদিয়া এক স্বতন্ত্র গ্রাম আর এ গ্রামের মানুষ ভিন্নতর আলোকে উদ্ভাসিত। জীবনের জটিলতা আর গভীরতা-অন্বেষা, মানিকের বিশেষ প্রবণতা হয়ে দাঁড়ায় এখানে। এ উপন্যাসে শশীর উপলব্ধি এ রকম: 'জীবনকে দেখিতে শিখিয়া, অত্যন্ত অসম্পূর্ণ ভাসা-ভাসাভাবে জীবনকে দেখিতে শিখিয়া, সে অবাক হইয়া দেখিয়াছে যে এইখানে, এই ডোবা আর মশা-ভরা গ্রামে জীবন কম গভীর নয়, কম জটিল নয়।' মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্তর্বাস্তবতার শিল্পী। মানব-মনের অতলের অাঁধি ও সম্ভাবনা চিত্রণে তিনি সিদ্ধহস্ত। তার সৃষ্ট ঘটনা আর চরিত্রের ধাপে ধাপে রয়েছে রহস্যময়তা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সংঘাত, জানা-অজানার দ্বন্দ্ব আর প্রেম ও কামের অসীমতা। পুতুলনাচের ইতিকথার কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র শশী অনুভব করে_ 'জানিবার এত বিষয়, উপভোগ করিবার এত উপায়, বিজ্ঞান ও কাব্য মিশিয়া এমন জটিল এমন রসালো মানুষের জীবন।' মানিকের চিন্তা কখনো অবসন্নতায় আচ্ছন্ন হয়নি, যাবতীয় বিষয় ও প্রবণতা তিনি প্রকাশ করেছেন মর্বিডচেতনার অন্তরালে এক আলোকবর্তিকার মনোরম শোভায়। তিনি রুগ্ন-মানসের ভাষ্যকার নন; সতেজ প্রাণের রূপকার। জীবনকে মানিক দেখেছেন নানান কৌণিক দৃষ্টিনিক্ষেপে। তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন বিভিন্ন চরিত্রের প্রতীকে। 
চরিত্র-নির্মিতিতে মানিক সবসময়ই ব্যতিক্রম। তিনি চরিত্রকে অাঁকেন যেন কোনো পেন্সিলের অস্পষ্ট দাগে। কিছুটা বোঝা যায়, কতকটা বোঝা যায় না। আর তার সৃষ্ট-চরিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো_ এরা চলমান; রূপান্তরশীল; আগে থেকে যেন এদের সম্পর্কে কিছুই বলা যায় না। তবে এই রূপান্তর কিংবা পরিবর্তনকে কখনো অস্বাভাবিক বা অবান্তর মনে হয় না_ যেন সবটাই অত্যন্ত সহজ ও সহনীয়। শশী এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় সব ঘটনা ও পাত্র-পাত্রী। আর শশী যেন জীবন-প্রেমিক এক সাদা মানুষ; মাটির মানুষ। সে জীবনকে শ্রদ্ধা করতে জানে। জীবনকে উপভোগ করতে জানে। জীবনের সংকীর্ণতা, মলিনতা, পঙ্গুতা_ সবকিছুকে ঘিরেই তার জীবনানুভূতি আর অভিব্যক্তির প্রকাশ, জীবনের প্রতি শশীর শ্রদ্ধা প্রকৃতঅর্থে সমগ্র জীবনের প্রতি ঔপন্যাসিকের শ্রদ্ধার প্রকাশ। শশীর সমগ্রতা-অভিব্যক্তি যেন মানিকেরই মানস প্রতীক। শশী সম্পর্কে প্রথমেই লেখক বলেছেন:
শশী চরিত্রে দুটি সুস্পষ্ট ভাগ আছে। একদিকে তাহার মধ্যে যেমন কল্পনা, ভাবাবেগ ও রসবোধের অভাব নাই, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ সাংসারিক বুুদ্ধি ও ধন-সম্পত্তির প্রতি মমতাও তাহার যথেষ্ট। তাহার কল্পনাময় অংশটুকু গোপন ও মূক। অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে তাহার সঙ্গে না মিশিলে এ কথা কেহ টের পাইবে না যে, তার ভিতরেও জীবনের সৌন্দর্য ও শ্রীহীনতার একটা গভীর সহানুভূতিমূলক বিচার-পদ্ধতি আছে। তাহার বুদ্ধি, সংযম ও হিসাবী প্রকৃতির পরিচয় মানুষ সাধারণত পায়।
শশী দায়িত্বশীল এক কর্মী-পুরুষ। কেবল ডাক্তার হিসেবে নয়; মানুষ হিসেবেও তার দায়িত্ববোধের পরিচয় আমরা পাই। মৃত হারু ঘোষকে গ্রামে নিয়ে গিয়ে সৎকারের ব্যাবস্থা করার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের শুরুতেই আমরা তার এ বৈশিষ্ট্যের মুখোমুখি হই। এ ছাড়া যেন দিদির প্রতি গভীর আগ্রহ এবং স্বাস্থ্যনীতি প্রবর্তন-চেষ্টা তার সেই দায়িত্ব জ্ঞানেরই বহির্পরিচায়ক। বিন্দুকে তার নরক থেকে বাঁচানোর মধ্যেও আমরা শশীর প্রবল দায়িত্ববোধের পরিচয় পাই। জীবনের সমগ্রতাকে ধারণ করে_ জীবনের এ-পীঠ ও-পীঠ দেখে অভিজ্ঞতার ঝুড়ি পূর্ণ করে শশী শেষত এক উপলব্ধির দারপ্রান্তে এসে পৌঁছায়। একদিকে দায়িত্বের বাড়-বাড়ন্ত, অন্যদিকে পরাজয়ের স্রোত_ এসব মিলে দায়িত্বের ভারই যেন বিজয়ের চৈতন্য লাভ করে। আর শশী তাই উপলব্ধি করে: 'নদীর মতো নিজের খুশীতে গড়া পথে কি মানুষের জীবনের স্রোত বহিতে পারে? মানুষের হাতে কাটা খালে তার গতি; এক অজানা শক্তির অনিবার্য ইঙ্গিতে। মধ্যাকর্ষণের মতো যা চিরন্তন, অপরিবর্তনীয়।' কুসুম পুতুলনাচের ইতিকথায় এক আকর্ষণীয় চরিত্র। শশীর প্রতি তার অনুভূতি, তার প্রকাশ আর জীবনকে এক চমৎকার পুষ্পশোভিত রূপকল্প ভাবার মধ্যে তার কোমলতা পাঠককে মোহিত করে। কুসুম সম্পর্কে শশীর পর্যবেক্ষণ_ 'কুসুমের এ রকম সরল মিথ্যা ভাষণ সে মাঝেমাধ্যে লক্ষ্য করিয়াছে। ধরা পড়িবে জানিয়া-শুনিয়াই সে যেন এই মিথ্যা কথাগুলো বলে। এ যেন তাহার এক ধরনের পরিহাস। কালোকে সাদা বলিয়া আড়ালে সে হাসে।' আবার কুসুমের অভিমান-অভিব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিত্বের পরিচয় মেলে, যখন 'পরানের কথা শুনিতে শুনিতে প্রতি মুহূর্তে শশী আশা করে_ পুবের ওই ঘরের ভিতর হইতে হয়তো দুচোখে গাঢ় স্তিমিত ছায়া সঞ্চয় করিয়া কুসুম হঠাৎ বাহির হইয়া আসিবে_ পরমাত্মীয়দের এই সভায় এক প্রান্তে দাঁড়াইয়া থাকিবে পরের মতো।' কতোবার যে কুসুম শশীর কাছে আত্মনিবেদন করেছে তার ইয়ত্তা নেই। 'পরানের বউ' বললে সে ভীষণ রাগ করে, মতির অপরিণত দেহকে হিংসা করে, শশীর বাগানের গোলাপের চারা বার বার মাড়িয়ে দেয়। আবার এক সময় তার এই আবেগ-অনুভূতির পরিসমাপ্তি ঘটে; পরিবর্তন আসে তার মনে। কয়েকটি উদ্ধৃতি দিলে কুসুম-চরিত্রের এই গতি ও ক্রম-পরিবর্তন আমাদের সামনে স্পষ্ট হবে:
'সইতে পারি না ছোটবাবু।'
'এমনি চাঁদনি রাতে আপনার সঙ্গে কোথাও চলে যেতে সাধ হয় ছোটবাবু।'
'মানুষ কি লোহায় গড়া যে চিরকাল সে একরকম থাকবে, বদলাবে না? বলতে বসেছি যখন কড়া করেই বলি, আজ হাত ধরে টানলেও আমি যাব না।'
মতির চরিত্রে আছে স্বপ্নালুতা। জীবন, বিয়ে ইত্যাদি নিয়ে তার প্রত্যাশা আর স্বপ্নের বিভোরতার কোনো শেষ নেই। মতি ভাবতে ভালোবাসে। জীবন সম্পর্কে কঠিন কোনো হিসাব-নিকাশ করতে যে আগ্রহী নয়। জীবনকে ফুলের মতো সুন্দর ভাবতে, সরল ভাবতে তার ভালো লাগে। একটি সচ্ছল, চমৎকার ভবিষ্যৎ-জীবনের প্রত্যাশা তার মনে। মতির বয়স কম। ভাবনা অসংলগ্ন-অপরিণত। মানুষ, জগৎ আর নিজের সম্পর্কে তার সমীকরণ অসামাঞ্জস্যপূর্ণ-অহেতুক। স্বপ্নে তার আবিলতা। সে 'একেবারেই কাঁচা মেয়ে।... যত হিসাবই ধরা যাক মতি কাঁচা মেয়েই।' তবে কুমুদকে পাওয়ার পর, তাকে ভালোবাসার পর মতি যেন বদলে যায়। যেন দ্রুত পরিণত হয়ে ওঠে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে যেন রাতারাতি বড়-বয়স্ক-হিসেবি-সংসারী বনে যায়। যেমন, শশীর অনুভব:
শশী বার বার বিস্মিত চোখে তাহার বিষণ্ন মুখ, ছলছল চোখের দিকে চাহিতেছিল। এক অপূর্ব ভাবাবেশে সেও উতলা হইয়া উঠিতেছিল। সংসারে হয়তো এমন অনেক আছে, মতির মতো এমন করিয়া ভালো হয়তো অনেকেই বাসে, কিন্তু মতি ইহা শিখিল কোথায়? অনুভূতির এমন গভীরতা তাহার আসিল কোথা হইতে? এ যে ভাব প্রবণতা নয়, কাঁচা-মনের অস্থায়ী আবেগ নয়, বালিকা মতির বিরহ-কাতরতায় এক অপূর্ব ধৈর্যের সমাবেশ দেখিয়া শশী তা বুঝিতে পারিয়াছিল।
কুমুদ ভারি চমৎকার লোক। ব্যক্তিত্বে, সম্মানবোধে আর চাল-চলনে সে ব্যতিক্রম_ আর দশজনের চেয়ে আলাদা করে তাকে চোখে পড়ে সবার। বাড়ি থেকে, চাকরি থেকে বিতাড়িত কুমুদ, জীবন থেকে পিছিয়ে-পড়া কুমুদ, দেমাগ থেকে সটকে-পড়া কুমুদ শেষে জায়গা করে নেয় যাত্রাদলে। তার ছাত্রজীবনের বন্ধু শশী তাদের গ্রামে আসা যাত্রাদলে কুমুদকে পেয়ে অবাক হয়। শশীর বাড়িতে কুমুদ আতিথ্য গ্রহণ করলে সে খুশী হয়। অহঙ্কারী কুমুদ, উদ্ধত কুমুদ, যাযাবর কুমুদ শেষ পর্যন্ত সংসারী হয়েছে। জীবনের হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে তার, মতির প্রেমে পড়ে। আর পাঠক যেন পেয়ে যান অন্য কুমুদকে। নমিত, প্রেম-ভাবাবেশ-আবিলতাপূর্ণ কুমুদকে। বিস্ময় মানে পাঠক। বিস্ময় মানে তার পরিচিতজনরাও। কুমুদের বন্ধু জয়ার ভাষ্য: 'তুই অবাক করেছিস মতি। রূপ-গুণ, বিদ্যা-বুদ্ধি, নাচ-গান দিয়ে কেউ যাকে বাঁধতে পারেনি, তাকে তুই কাবু করলি, এক ফোটা মেয়ে? কম তো নোস তুই।' গোপাল বৈষয়িক-সংসারী। পুত্র শশীর প্রতি তার মমতা অসীম। তিনকন্যার প্রতি তেমন মায়া-মমতা নেই। ছেলের সঙ্গে চলে মান-অভিমান, প্রায়ই কথা বন্ধ থাকে_ 'ছেলে বড় হইলে কি কঠিন হইয়া দাঁড়ায় তার সঙ্গে মেশা। সে বন্ধু নয়, উপরওয়ালা নয়, কি যে সম্পর্ক দাঁড়ায় বয়স্ক ছেলের সঙ্গে মানুষের, ভগবান জানেন।' গোপাল তার মেয়ে বিন্দুকে কলকাতার বড় ব্যবসায়ী নন্দনালের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে গ্রামে এক বিস্ময়ের ব্যাপার ঘটায়। এছাড়া যামিনী কবিরাজের পিছিয়ে-পড়া চিকিৎসাব্যবস্থার অবস্থা, নবতর চিকিৎসা-বিজ্ঞানের সঙ্গে মানসিক দ্বন্দ্ব-ঈর্ষা আর সেনদিদির মানসিক কষ্ট, স্বামী যামিনীর প্রতি অনাস্থা, শশীর প্রতি প্রবল মমতা আর আস্থা মানব-মনের সঙ্কট আর বিচিত্র রূপেরই প্রতীক মাত্র। 
জীবনকে দেখার, বোঝার আর প্রকাশ করার ভঙ্গি মানিকের স্বতন্ত্র। যেন কোনো কিছুকেই এড়িয়ে যাওয়া তার চলে না। ঘটনার ডিটেইলস কিংবা অনুভবের গভীরতা তার উপন্যাসের প্রাণবস্তু। পুতুলনাচের ইতিকথায় নিয়তির অমোঘতা, মানব-জীবনের চালচিত্র ও বাস্তবতা আর যাপিত জীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের বিবরণে মানিক দারুণ কৌশলী। এই উপন্যাসটি পাঠের আনন্দ পাঠককে বহুকাল পর্যন্ত আলোড়িত করে, বিমুগ্ধ করে আর যেন অনবরত কী সব ভাবায়।


পুতুলনাচের ইতিকথা: নামকরণের যাথার্থ্য
 রাফাত মিশু 

বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার এক নবতর নিরীক্ষা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-৫৬) পুতুলনাচের ইতিকথা (১৯৩৬) উপন্যাসটি মানুষের মনোরহস্য ও প্রকৃতির অন্তর্বহিঃরহস্যের উন্মোচন ও অনোন্মোচনের আখ্যান। বাস্তবতার সমগ্রতাকে ধারণ করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিত্যকার মানুষের মনের অতলান্তের নিত্য দোলাচলের রূপায়ণ ঘটিয়েছেন এই উপন্যাসে শশী-কুসুম-যাদব-কুমুদ প্রমুখ চরিত্রের মধ্য দিয়ে। প্রতি মুহূর্তে যেন তারা উপন্যাসের নামকরণকে কখনো সত্য করে তোলে, আবার কখনো নিমজ্জিত করে অনন্ত-গহীন অতিমাত্রায়।
এক সাধারণ গ্রাম গাওদিয়া আর তার সাধারণ মানুষদের নিয়ে এ উপন্যাসের গল্প। সাধারণ মানুষগুলোর মধ্যে নিয়তি ও কার্যকারণশৃঙ্খলের টানাপোড়েন যেন উপন্যাসের প্রথম থেকেই সংকেতিত। বজ্রাঘাতে হারু ঘোষের মৃতদেহ আবিষ্কার-দৃশ্য দিয়ে উপন্যাসের শুরু আর মাটির টিলার ওপর উঠে শশী ডাক্তারের সূর্যাস্ত-দর্শনের শখের অতৃপ্ততা দিয়ে উপন্যাসের সমাপ্তি। এরই মধ্যে দশ বছরের কালপরিসরে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন চরিত্রের নিয়তির প্রতি আত্মসমর্পণ ও বিদ্রোহের ইতিকথা।

শশী এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। পেশায় ডাক্তার। এক হিশেবে এই কাহিনি শশী ডাক্তারেরই কাহিনি। তবে তার অস্তিত্ব প্রথিত হয়ে আছে আরো বিভিন্ন চরিত্র ঘটনা উপঘটনার অনুষঙ্গে। এই শশীকেই হারু ঘোষের বজ্রাহত মরদেহ আবিষ্কার করে গ্রামে নিয়ে আসতে হয়েছে। পরান-ভার্যা কুসুমের প্রতি আকর্ষণ-বিকর্ষণের দ্বন্দ্বে দোদুল্যমান থাকতে হয়েছে, যাদব পণ্ডিতের স্বেচ্ছামৃত্যু নামক প্রহসনের নির্বাক সাক্ষী হতে হয়েছে, মাতৃসমা সেনদিদির প্রতি এক রহস্যময় সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ হতে হয়েছে। আবার, এই শশীকেই সবিস্ময়ে দেখতে হয়েছে কুমুদ-মতির প্রবল জীবনাগ্রহ এবং নিয়তি নামক অলীক সত্তার সুতো ছিঁড়ে জীবন-উপভোগের মহাযজ্ঞে বেরিয়ে পড়ার দৃশ্য। তাই শশী ও তার পরিপার্শ্বের মানুষ ও ঘটনা থেকে মনে সহসাই প্রশ্ন জাগে- কে বা কারা পুতুল? আর কে-ই বা ওই পুতুলের সুতো ধরে টানছে? আর কারাই বা এই পুতুলনাচ না নেচে নিজেদের মানুষ করে তুলছে?

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মীমাংসিতভাবেই বিজ্ঞানমনস্ক অর্থাৎ কার্যকারণচেতনাচালিত জীবনে বিশ্বাসী। তাঁর জীবনপাঠ থেকে অন্তত তা-ই অনুমেয়। তিনি নিজেই বলেছেন-
সত্যই তো আর পুতুল নয় মানুষ। অদৃশ্য শক্তি বা অন্য অন্য মানুষের আঙ্গুলে বাঁধা সুতোর টানে সত্যই তো মানুষ পুতুলের মত নাচে না।
তবুও কেন এই উপন্যাসের নাম পুতুলনাচের ইতিকথা, তা যেন কিছুটা রহস্যাবৃতই মনে হয়।
মানুষের উপায়হীন পরাজয়, নির্বিকার আত্মসমর্পণ ও অসহায় অস্তিত্বচেতনার সঙ্গেই পুতুল-প্রসঙ্গটি জড়িত। মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাস ও সেই বিশ্বাসের কাছে ও সংস্কারের কাছে উপায়হীন আত্মসমর্পণই মানুষকে পুতুল করে দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সচেতনভাবে এক গ্রামীণ আবহে অথচ কলকাতা ফেরত আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত শশীডাক্তারের মনোজাগতিক জটিলতাকে উপজীব্য করেছেন আলোচ্য উপন্যাসে। মানিক এখানে বহির্বাস্তববাদী যতটুকু তার চেয়ে তিনি একান্তই মনোবাস্তবতার শিল্পী। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নেহাৎ-বস্তুবাদী শিল্পী নন- অনেকখানি আন্তর্বাস্তবতার শিল্পী। এর সাক্ষ্য তাঁর চরিত্রের মনোবাস্তবতায় যেমন প্রাপ্তব্য, তেমনি পাওয়া যাবে তাঁর রহস্যময়তার ব্যবহারে।
উপন্যাসের বিভিন্ন অংশেই নিয়তি-প্রসঙ্গ চলে আসে। কিন্তু এই নিয়তি কে বা কী? এই নিয়তি কি কোনো অদৃশ্য শক্তি নাকি তা বাস্তবতারই আরেক রূপ?
শশী-কুসুম সম্পর্কটি মানবিকতার দিক থেকে যতোই সমর্থনযোগ্য হোক না কেন, তৎকালীন গ্রামীণ সমাজবাস্তবতায় তার বাস্তব রূপদান সত্যিই দূরূহ। এখানে শশীর টানাপোড়েন নিয়তির সঙ্গে বাস্তবতার নয় বরং বাস্তবতার সঙ্গে বাস্তবতার টানাপোড়েন। একদিকে মনের অবচেতন জগতের আহ্বান, অন্যদিকে ওই মনেই শেকড়-গেড়ে-বসা সমাজসত্য। কিন্তু কুসুমের দিক থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ইঙ্গিত পাওয়া সত্ত্বেও শশীর অনগ্রসরতা তাদের সম্পর্ককে এক বিয়োগাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। অবশ্য সম্পর্কের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে শশীর আহ্বানে আর সাড়া দেয় না কুসুম। কারণ-
লাল টকটকে করে তাতানো লোহা ফেলে রাখলে তাও আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে যায়, যায় না?২ (কুসুমের উক্তি)
আবারো কুসুমের প্রশ্ন-
কুসুম কি বেঁচে আছে? সে মরে গেছে।
শশী তার হৃদয় সংবেদনের জয় ঘটাতে পারেনি। শশী যে কেবল শশীই নয়, সে শশীডাক্তার। আবার, মার্কসীয় সামন্তসমাজ দৃশ্যমান না হলেও শশীর সমাজ সামন্তসমাজ তার বাবা গোপাল দাস নানা দোষে দুষ্ট এক সামন্ত ব্যক্তি, তাই শশীর এ পরাজয়ের অদৃশ্য কোনো শক্তির কাছে পরাজয় বলা যায় না। বলা যায়- সমাজ ও সংস্কারে শৃঙ্খলের সুতোয় বন্দি সে। অন্যদিকে, ঔপনিবেশিকতা এ উপন্যাসে প্রচ্ছন্ন হলেও শশীর এই পুতুল সত্তায় তা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। শশী তিরিশের উপনিবেশের মধ্যবিত্ত জীবনের নিহত উচ্চাকাঙ্ক্ষায় প্রতিভূ। শশীর জীবনে এবং মনে গাওদিয়ার জটিল প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই তাই গাওদিয়া রূপময় হয়ে ওঠে।
খুব ছোটো পরিসরে হলেও নন্দ-বিন্দুর গল্পটিকেও পুতুল হওয়া না হওয়ার সমীকরণে যাচাই করা যায়। শশীভগিনী বিন্দুর পরিণতিকে নিয়তির খেলা বলে মনে হলেও তা যথেষ্ট কার্যকারণ সূত্রে বিচারযোগ্য। কারণ- বাবা গোপালের শঠতা, প্রতারণা আর গোয়ার্তুমির ফলেই বিন্দুকে নন্দের রক্ষিতা হতে হয়। তাই স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে আসলেও সে স্বাভাবিক হতে পারে না। অভ্যস্ততা নামক ব্যাধিতে ততোদিন সে আক্রান্ত হয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক সামন্ত শাসকের আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া গেল নন্দের মধ্যে এবং বিন্দুর ট্র্যাজেডিতে। তাই, বিন্দুর পরিণতি অলৌকিক বা নিয়তি নির্ভর নয়, লৌকিক। বিন্দু যদি পুতুল হয়েও থাকে তবে তা একান্তই মনুষ্যনির্মিত নোংরা বিধানের অভিশাপে।
যাদব পণ্ডিত ও পাগলদিদির ইচ্ছামৃত্যু যেন আরেক রহস্যের জালে আমাদের আবদ্ধ করে আবার সেই রহস্য এক ভিন্ন সত্যের ইঙ্গিত দেয়। আপাত অর্থে যাদবকে আধ্যাত্মিক, সূর্যবিজ্ঞান, জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাসী মনে হলেও আদতে সে প্রবলভাবে জীবনবাদী, জীবনপিপাসু ও ঐহিক। উপন্যাসের কাহিনিতে তার আগমন ঘটে সাপের ভয়ে লাঠি ঠুকে ঠুকে-
লাঠি ঠুকিয়া ঠুকিয়া পথ চলেন। শশী জানে- এত জোরে লাঠির শব্দ করা সাপের জন্য। মরিতে যাদব কি ভয় পান- জীবন-মৃত্যু যাঁর কাছে সমান হইয়া গিয়াছে?
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই যাদবই তার এক চকিত মন্তব্যের বাস্তবায়ন করে মৃত্যুউৎসবের মধ্য দিয়ে। বলা যায়, নিজের ভাগ্যকে সে নিজেই গড়লো। ইচ্ছামৃত্যু নামক এক প্রহসন মঞ্চস্থ করলো এবং তার একমাত্র দর্শক বা সাক্ষী শশী, নিয়তি বা অদৃশ্য কোনো শক্তি নয়। এক হিশেবে যাদব যেন শশী নামক পুতুলের প্রতি ব্যঙ্গ হাসি হাসলো। অথচ ‘ইচ্ছামৃত্যু’ মূল রহস্য জেনেও শশী এক নির্বিকার দর্শকমাত্র। শশী যদি সেই সত্যকে একবার প্রকাশ করতে পারতো, তবে কিছু সময়ের জন্য হলেও সে মানুষ হয়ে উঠতে পারতো। মূলত, যাদবের মৃত্যু এ উপন্যাসের নিছক উপকাহিনি নয়, বরং শশী চরিত্র ব্যাখ্যানে এক অপরিহার্য সহভাগী।
‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় কেবল পুতুলদের কথাই ব্যক্ত হয়নি, বরং মানুষ সত্তা নির্মাণের মধ্য দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুতুল ও মানুষের দ্বৈরথ নির্মাণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে সমালোচকের মত-
“কখনো একক চরিত্রকে উপলক্ষ করে, কখনো-বা বিপরীত যুগল চরিত্র সৃজন করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়তির পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তিকে দাঁড় করিয়ে দেন। …’পুতুলনাচের ইতিকথা’য় ভাগ্যবিড়ম্বিত এবং ভাগ্য নির্মাতা চরিত্রের চলাচল বিস্তর। মানিক সমগ্র উপন্যাসটিতে এই দুই পক্ষ মানুষ এবং কথিত অদৃশ্য ভাগ্যদেবতার কথা সংলাপে-বর্ণনায়-ভাষ্যে নানাভাবে উপস্থাপন করেছেন।”৬
নিয়তির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে মানুষ হয়ে ওঠার গল্প কুমুদ-মতির গল্প। যাত্রাদলের প্রবীর তথা “মোনালিসার কুমুদ, শেলি বায়রন হুইটম্যানের কুমুদ, পেগ খাওয়া ডধষঃু ভড়ীঃৎড়ঃ নাচা কুমুদ, নীলাম্বরীর প্রেমিক কুমুদ”৭ মতিকেই কেবল জয় করেনি, বরং শশীর বন্দিত্বকেও প্রকটিত করে তুলেছে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও কুমুদ যা পারে, শশীর পক্ষে তা সম্পন্ন করা অসম্ভব। শশীর অসহায়ত্ব কেবল অন্তর্চাপে সৃষ্ট নয়, বহির্চাপেও শশী পিষ্ট। তাই এই অসহায়ত্বকে সে কোনোভাবেই যুক্তি-বুদ্ধির তলোয়ার দিয়ে শিরচ্ছেদ করতে পারে না।
কুমুদ-মতির এই গল্প একদিকে তৎকালীন উপনিবেশ-শাসিত সমাজে শহর ও গ্রামের বিস্তর পার্থক্যকে দৃশ্যমান করেছে, তার চেয়েও বেশি শশীর মনঃ ও বহির্জাগতিক বন্ধনকেও নির্দেশ করেছে।
যাত্রাদলের প্রবীর সেজে এক গ্রাম্য-অশিক্ষিত-অসংস্কৃত নারী মতির হৃদয় জয়, মতির সঙ্গে কুমুদের বিয়ে, অতঃপর কলকাতার শাহরিক জীবনের সঙ্গে মতির পরিচয় ও যাযাবর জীবন যাপনের যাত্রী, শেষে নিরুদ্দেশ ও বোহেমিয়ান পথ পাড়ি দেবার দৃশ্যপটগুলোতে যেন কেবলই কথিত নিয়তির বিপক্ষে মানুষের তীব্র হুঁশিয়ার অনুরণিত হয়েছে। তবে খোদ ঔপন্যাসিক এই উপকাহিনিকে প্রক্ষিপ্ত বললেও এটি উপন্যাসের অন্তর্বয়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকের দাবিদার।
শশী শৃঙ্খল থেকে বের হতে পারলো না। পুতুলের সুতো ছেঁড়ার সাহস বা ক্ষমতার যে কিছুটা ঘাটতি তার মাঝে ছিল- একথা এখন বলা যায়। সেই গাওদিয়া গ্রাম, যাদব পণ্ডিতের হাসপাতাল, পিতার পৈতৃক ভিটা এসবেই শশীর আশ্রয়। কুসুমজয়ের স্বপ্ন, বিলেত যাওয়ার স্বপ্ন, জীবনকে উপভোগ করবার স্বপ্ন কেবল স্বপ্নই থেকে যায়। উপন্যাসের শেষ বাক্যেও যেন সেই স্বপ্নভঙ্গের হতাশা নিনাদিত হয়-
“মাটির টিলাটির উপর উঠিয়া সূর্যাস্ত দেখিবার শখ এ জীবনে আর একবারও শশীর আসিবে না।”৮
‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় কোথাও আক্ষরিক পুতুলনাচের দৃশ্য নেই। তবে মানুষের মাঝেই পুতুল যে নানাভাবে খেলা করে অথবা মানুষই পুতুল হয়ে নাচে আর সুতোছেড়া প্রকৃত মানুষের উপস্থিতিতে পুতুলের স্বাতন্ত্রীকরণ স্পষ্ট হয়- তাই পুতুলনাচের ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হয়েছে। মূলত, পুতুল হওয়া না হওয়ার যুগপৎ দ্বন্দ্ব ও মিথস্ক্রিয়ায় উপন্যাসটির নামকরণ ব্যঞ্জনাময় এবং আলংকারিক বিবেচনায় অনেকখানিই যথার্থ।

তথ্যসূত্র

১. আবদুল মান্নান সৈয়দ, বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৪, পৃ. ২৩৪

২. পুতুলনাচের ইতিকথা, ১৩ সংখ্যক পরিচ্ছেদ

৩. প্রাগুক্ত
৪. সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা উপন্যাসের কালান্তর, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০০, পৃ. ২৭৪
৫. পুতুলনাচের ইতিকথা, ২ সংখ্যক পরিচ্ছেদ
৬. ভীষ্মদেব চৌধুরী, নিয়তির পক্ষ-বিপক্ষ অথবা পুতুল ও মানুষের দ্বৈরথ, ভীষ্মদেব চৌধুরী ও সৈয়দ আজিজুল হক (সম্পাদিত), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: শতবার্ষিক স্মরণ, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ১৫০…১৫৩
৭. পুতুলনাচের ইতিকথা, ৫ সংখ্যক পরিচ্ছেদ
৮. প্রাগুক্ত, ১৩ সংখ্যক পরিচ্ছেদ।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য দর্শন

আশরাফ জামান

বৈজ্ঞানিক সত্যকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁর প্রলেতারিয়েতের বিরাটত্ব ও ব্যক্তি মানবতার পরিচয় তুলে ধরার জন্যই মানিক কলম হাতে তুলে নেন। মধ্যবিত্ত সমাজে জন্ম নিয়ে নিজের শ্রেণীকে অস্বীকার করে নিম্নশ্রেণীর মানুষের চরিত্রকে গৌরবান্বিত করেছেন তিনি। মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে বলতেন মেকি। পদ্মানদীর মাঝি লিখবার সময়ে পদ্মানদীর মাঝিদের সঙ্গে বহুদিন একত্রে সময় কাটিয়েছেন। তাদের সঙ্গে রাত কাটিয়েছেন, খাবার খেয়েছেন।


‘অৎঃ ভড়ৎ ধৎঃ ংধশব’ শিল্পের জন্য শিল্প এ নীতিতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন না। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানিক ভারতীয় কমুনিস্ট আন্দোলনের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন।

মার্কসবাদ লেলিনবাদের সাথে এভাবে তাঁর সৃষ্টির নাড়ীর যোগ। নিম্নস্তরের মানুষের জীবন কাহিনীর সংবেদনশীল রূপকার হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা কথা সাহিত্যে তিনিই প্রথম সচেতনভাবে মার্কসবাদের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তাঁর এই প্রয়োগ সম্পর্কে নিজেই বলেছেন, ‘মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচয় হবার পর আরও ব্যাপক ও গভীরভাবে সে পরিবর্তন ঘটবার প্রয়োজন উপলব্ধি করি। আমার লেখায় যে অনেক ভুল-ভ্রান্তি, মিথ্যা আর অসম্পূর্ণতার ফাঁকি আগেও ছিল আমি তা জানতাম। কিন্তু মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচয় হবার আগে এতটা স্পষ্ট ও আন্তরিকভাবে জানবার সাধ্য হয়নি।”

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসগুলিতে মার্কসীয় দর্শন ফ্রয়েডীয় যৌনচেতনা এ দুটো দিক সার্থকতভাবে বিকাশ লাভ করেছে। মার্কসের রাজনৈতিক শ্রেণী চেতনা ও অর্থনৈতিক চিন্তাধারা এতে সবচেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল। তাঁর লেখায় এসেছে নিম্ন শ্রেণীর মানুষ অর্থাৎ চাষী, জেলে, মজুরের বলিষ্ঠ জীবনের প্রবল আকর্ষণ। যা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণ মানিককে স্বাভাবিকভাবেই মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। ব্যক্তিগত জীবনে মধ্যবিত্তের দোদুল্যমান জীবনের কৃত্রিমতা তাঁর মনে বিতৃষ্ণা এনে দিয়েছিল।
শোষণ, নিপীড়িত শ্রেণী দ্বন্দ্বের অসঙ্গতিতে বিভক্ত সমাজের বিবেকবান সাহিত্যিকের কাছে মার্কসবাদ একটি আদর্শ। এই আদর্শই মানিককে মুগ্ধ করেছে। এদিক থেকে তিনি অন্য লেখকদের থেকে ভিন্ন। বাংলা সাহিত্যে এমন অনেক লেখক আছেন যাঁরা সারাজীবন চিলাসব্যসনে মত্ত থেকে বা সমাজের উঁচু স্তরে অবস্থান করেও নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে লিখেছেন। লেখায় সর্বহারাদের জন্য কুম্ভিরাশ্রু বিসর্জন করেছেন মানিক তাদের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র।
মানিক প্রলেতারিয়েতের গভীর সমুদ্র থেকে স্নাত। তিনি নিষ্ঠাবান মানব প্রেমিক। মানিকের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ নিম্ন শ্রেণীর শোষিত বঞ্চিত মানব জীবনের আলেখ্য। যে জীবনে পদ্মা পারের দুঃখপীড়িত মাঝিরা সারাদিন পরিশ্রম করেও দুবেলা আহার জোগাতে পারে না। পদ্মা নদীর মাঝিদের সংগ্রামমুখর জীবনের বর্ণনা মানিক দিয়েছেন এভাবেÑ “আসে রোগ, আসে শোক।... জন্মের অভ্যর্থনা এখানে গম্ভীর নিরুৎসব বিষণœ। জীবনের স্বাদ এখানে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসায়, কাম ও মমতায় স্বার্থ ও সংকীর্ণতায় আর দেশী মদে।”
মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করতে গেলে আমরা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে দেখি অসাম্প্রদায়িক শ্রেণী চেতনার উক্তি। ‘মধ্যাহ্নে নৌকা ভিড়াইয়া রাঁন্নার আয়োজন করা হইল। নিজেদের জন্য ভাত রাধিবার ভারটা কুবেরের উপরই পড়িয়াছিল। অদূরে রন্ধনরতা রসুলের বোন নছিরনকে দেখিতে দেখিতে কুবের মনে মনে একটু আপসোস করিল। ভাবিল, কি ক্ষতি মুসলমানের হাতে রাঁন্না খাইলে? ডাঙ্গার গ্রামে যাহারা মাটি ছানিয়া জীবিকা অর্জন করে তাহাদের মধ্যে ধর্মের পার্থক্য থাক, পদ্মা নদীর মাঝিরা সকলে এক ধর্মী। গণেশ, শম্ভু ওরা সঙ্গে না থাকিলে কুবের তো নিজের জন্য রাঁধিতে বসিত না।’
এটা যেন লেখকের প্রলেতারিয়েত শ্রেণী চেতনার অস্ফুট উক্তি। এ যেন পলরবসনের সেই গানÑ
‘ডব ধৎব ড়হ ঃযব ংধসব নড়ধঃ নৎড়ঃযবৎ’.
এখানে হোসেন মিয়া চরিত্রটি অঙ্কন করেছেন লেখক মনের মাধুরী মিশিয়ে। এ জাতীয় চরিত্র বাংলা সাহিত্যে দুটি বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না।
মার্কসীয় তাত্ত্বি¡ক দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শহরতলী উপন্যাসটি। এ উপন্যাসের প্রধান স্তম্ভ যশোদার মতো চরিত্র বাংলা সাহিত্যে আর নেই। সর্বহারার আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন এতে প্রকাশ পেয়েছে।
যশোদার মনোভাব থেকে দেখি : “রাঁন্না করিতে করিতে যশোদা ভাবে ‘না তার কুলী মজুররাই ভাল। এদের যদি আপন না করিবে আপন হইবে কারা? সত্য প্রিয়ের মতো যারা বড়লোক অথবা জ্যোতির্ময়ের মতো যারা ভদ্রলোক?.... সুবীরের মত একজন করিয়া প্রত্যেকদিন তার সঙ্গে বেয়াদবি করুক তবু যশোদা চিরদিন এদেরই ভালবাসিবে।”
যশোদার এই জন্মগত স্বভাবই শ্রেণী চেতনা। শ্রেণী হিসেবে সর্বহারাদের প্রতি মানিকের মমত্ববোধ এত তীব্র।
মার্কসীয় দর্শনের উত্তরণ ঘটেছে ‘দর্পন’ উপন্যাসে। জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের বৃহত্তর পটভূমিতে ধারা বদলের লক্ষণ রয়েছে এতে।
‘দর্পন’ উপন্যাস দেখিয়ে দেয় যে, মার্কসীয় দর্শনেই অদম্য মুক্তি সংগ্রামের ভবিষ্যতবাদী আশাবাদী পরিপ্রেক্ষিতরূপে গ্রহণ করেছেন। দর্পনে শিল্পপতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে তাঁর ছেলেই। এই উপন্যাসেই মানিক শ্রেণী সংগ্রামের দলিল রচনা করেছেন।
‘দিবারাত্রির কাব্যের’ চরিত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে : চরিত্রগুলি কেউ মানুষ নয়, মানুষের চৎড়লবপঃরড়হ মানুষের এক এক টুকরো মানসিক অংশ। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে শশী চরিত্রের মধ্য দিয়ে রেমান্টিক ও বাস্তব এ দুটো দিক উদ্ঘাটন করেছেন লেখক। জনৈক সমালোচক শশী চরিত্রের সঙ্গে আলবেয়ার ক্যামুর তুলনা করেছেন। অবশ্য ‘প্লেগের’ বহু পূর্বে মানিকের পুতুল নাচের ইতিকথা প্রকাশ পায়।
অহিংসা উপন্যাসে আশ্রমের ভ-ামি, ধর্মান্ধতা ও যৌন লালসার উদ্ভট কাহিনী মার্কসীয় বস্তুনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণনা করা হয়েছে। দেশ ও পৃথিবীতে যে অগণিত মেহনতি সর্বহারা মানুষ রয়েছে যারা সমাজে ধিক্কৃত, লাঞ্ছিত, অপমানিত সেই সর্বহারাদের স্বার্থক জীবন রূপকার হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

 

কেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

মানিক এখন হয়তো দূরতম প্রদীপ। জ্বলজ্বল নক্ষত্রকে কত আলোকবর্ষ দূর থেকে দেখলে তা মঙ্গলপ্রদীপের মতো সৌম্যরূপ ধারণ করে— তা অনুধাবন করা কষ্টকর নয়। বাংলাদেশী পাঠকসমাজ পাঠাভ্যাস ত্যাগ করেছে প্রায় সর্বাংশে, সাহিত্যপাঠকে নির্বাসন দিয়েছে আরো আগে; এখন কেবল তারাই পড়ে, যারা লেখে বা লেখার সাথে পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। যদিও সারা দুনিয়ায় এখনো ফিকশন রাইটাররা কিন্ডলের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর আমরা আমাদের নক্ষত্ররাজিকে ম্রিয়মাণ করে রাখছি, আপন অজ্ঞতার চশমা চোখে দিয়ে, স্মার্টলি।
কিন্তু কথাকার মানিক প্রবল, অলঙ্ঘনীয়, অবশ্যপাঠ্য। কুবের-কপিলার রসায়নের ভেতর কলেজগামী কোমলমতিরাও বিহার করছে, শ্রেণীপাঠ্য বলে কি মানিক বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে? নাকি প্রাগৈতিহাসিক, পুতুল নাচের ইতিকথার মধ্যে লুকায়িত মানববিজ্ঞানের সূত্রগুলো আপন ক্ষমতাবলেই বাঙালি পাঠককে পৃষ্ঠা-অক্ষরের জগতে ফিরিয়ে আনে বারবার। এর জন্য পাঠকের করুণা বা সিলেবাস নির্মাতা প্রশাসকের মুগ্ধতার প্রয়োজন নেই। আমরা মানিককে স্মরণ করব— বাংলা কথাসাহিত্যের বিস্তৃত ভূগোলে অগ্রগামী স্রষ্টা হিসেবেই। যারা মানিককে কেবল পদ্মানদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথার মাধ্যমে পাঠ করতে চান, তাদের সাগর সেচে মুক্তো আনা এখনো বাকি আছে। ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’ বলে— এখনি মানিক কথাসাহিত্যে নিমজ্জন অনিবার্য। যারা চরিত্রাবিধানে পরাক্রমশালী হয়ে ঠাঁই নিয়ে থাকেন ক্যালেন্ডারের পাতা ধরে। এই ডাকাডাকির মধ্যে রয়েছে দায় মোচন অথবা কারুণ্য, কিঞ্চিত্ সম্মান প্রদর্শন। উপযোগবাদী এই সময়ে সাহিত্যকে আমরা আলস্য ও অবসরের বৈচিত্র্যসন্ধানী মনের বিক্ষিপ্ত মিডিয়ায় পরিগণিত করেছি। মানিক তাঁদের মতো নন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মগজ দিয়ে পাঠকের মগজকে শাণিত করেছেন, ব্রেইনস্টর্ম তুলেছেন পাঠকের চিন্তাজগতে।
অচ্ছুত নিম্নবর্গের মানুষকে উপন্যাসের জমিনে সংস্থাপন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান কৃতিত্ব। নিম্নবর্গকে নিয়ে কাজ করেছেন অনেক ঔপন্যাসিক, সাধারণত বাংলা ঔপন্যাসিকরা এসেছেন উচ্চমধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত এলিট সমাজ থেকে। এদের মধ্যে কিছু জমিদার শ্রেণীভুক্ত, কিছু বা ব্রিটিশ শাসন কাঠামোভিত্তিক বৃত্তিতে নিযুক্ত। ‘উপন্যাস লেখকরা পরনির্ভর এবং শাসকশ্রেণীর অংশীদার। এই মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ভুক্ত লেখকরা ইতিহাস, রোমান্স ও পরিচিত-পরিবেশ: এই তিন উত্স থেকে তাঁদের উপাদান সংগ্রহ করেন। তার বাইরেকার যে বিশাল নিরক্ষর দরিদ্র গ্রামীণ ভারতবর্ষের কোটি কোটি মানুষ, তাঁরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত লেখক ও পাঠকসমাজের কাছে অপরিচিত ও ধূসর অনামিকতায় আবৃত। এই বিশাল অপরিচিত জনসমাজের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া মধ্যবিত্ত লেখকের পক্ষে সুকঠিন। দারিদ্র্য আর মানবতার অপমান তাঁদের কাছে গল্প-উপন্যাসের রোমান্টিক উপাদান মাত্র’ (অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, কালের প্রতিমা, পৃ. ২২৫)। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই ধূসর অনামিকতায় আবৃত মানুষকে উপন্যাসপটে চিত্রিত করেছেন।
কথাসাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যয়ের কৃতিত্ব চিহ্নিত করতে হলে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। বাংলা উপন্যাসের সূচনালগ্নে বিশেষ করে সামাজিক নকশা এবং প্যারীচাঁদ মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের উপন্যাসে ‘নিম্নবর্গ’ কাহিনীর প্রয়োজনে ক্ষুদ্র অবস্থান লাভ করলেও, তাদের বিচ্ছিন্ন, দুর্বল ও সামঞ্জস্য বিধানের উপকরণ ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যায়নি। মানিকই পদ্মানদীর মাঝিতে কল্পনা ও সৃষ্টিশীলতার অসীম ক্ষমতাবলে ‘নিম্নবর্গ’কে পরিবেশন করেন। এর পর থেকেই নাগরিক সভ্যতার করালগ্রাসে ম্রিয়মাণ আদিবাসী; ধর্মীয় বিবেচনায় নিচু জাত (শিডিউল কাস্ট), অর্থবিত্তের নিরিখে লাঞ্ছিত-বঞ্চিত ও দুর্বল মানুষগুলো উপন্যাসে স্থান পাওয়া শুরু করে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই লেখকের হূদয়ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয় লেখকের বুদ্ধিবৃত্তি। চিন্তা ও কল্পনার গভীরতা দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবেশ করলেন নিম্নবর্গের জীর্ণ বাসগৃহে, কখনো কখনো অশান্ত অন্তর্লোকে। ফলে ক্রমেই উদ্ভাসিত হলো নিম্নবর্গের অন্তর্গত গভীর-বিস্তৃত সাংস্কৃতিক বিশ্ব, যা বাংলা উপন্যাসের জগেক করে তুলল বিস্তৃত ও সমগ্রতাসন্ধানী। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এভাবে উপেক্ষিত নিম্নবর্গের প্রতি গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টি ফেললেন উপন্যাসের জমিনে এবং তাঁদের চারপাশের চেনাজানা সমাজে আর শতাব্দীব্যাপী অবহেলিত দুঃখে-সুখে মূক অখ্যাত নিম্নবর্গের প্রতি।
ব্যক্তিজীবনে অভিজাত এবং জন্মসূত্রে উঁচু জাতের বাংলা ঔপন্যাসিকরা নিম্নবর্গকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করে তাদের নিয়ে গল্পকথা সৃষ্টি করেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই এ ব্যর্থতার স্বীকৃতি দিয়েছেন— ‘মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে। ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ঐকতান’, জন্মদিনে)।’ শৈলজানন্দের সঙ্গে ‘কয়লাকুঠি’ গল্পের প্রসঙ্গেও রবীন্দ্রনাথ এ কথা স্বীকার করেন, ‘আমরা দোতালার জানালা দিয়ে গরিবদের দেখেছি, তুমি তাঁদের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে তাদের সুখ-দুঃখ অনুভব করেছো গভীর ভাবে’ (রতনকুমার দাস ‘শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়: জীবন ও রচনাপঞ্জি’, পৃ. ৫৬৫)।
বুদ্ধির সাহায্যে নিম্নবর্গকে উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। নিম্নবর্গ চরিত্র সৃজনে তাঁর পদ্মানদীর মাঝি বাংলা উপন্যাসে একটি অভিনব সৃষ্টি। পদ্মানদীর মাঝির আগেও উপন্যাসে পার্শ্বচরিত্র সূত্র ধরে শ্রমজীবী মানুষের আত্মপ্রকাশের অবকাশ ঘটলেও কিন্তু শ্রমজীবী শ্রেণীর বাস্তব জীবনবোধ প্রাধান্য পেল পদ্মানদীর মাঝিতে। পূর্বের নিম্নবর্গ উপস্থাপন প্রক্রিয়াকে মানিক নিজেই সমালোচনা করেছেন। ‘শৈলজানন্দের গ্রাম্যজীবন ও কয়লাখনির জীবনের ছবি হয়েছে অপরূপ—কিন্তু শুধু ছবি হয়েছে। বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে এর বাস্তব সংঘাত আসেনি। বস্তিজীবন এসেছে কিন্তু বস্তিজীবনের বাস্তবতা আসেনি— বস্তির মানুষ ও পরিবেশকে আশ্রয় করে রূপ নিয়েছে মধ্যবিত্তের রোমান্টিক ভাবাবেগ’ (লেখকের কথা, ১৯৫৭)। পদ্মানদীর মাঝির কেন্দ্রীয় চরিত্ররা সকলেই পদ্মাতীরের মাঝি, জেলে-ধীবর ও অন্যান্য নিম্নবর্ণের সম্প্রদায় ও এর সমস্ত ঘটনাই তাদের জীবন-নির্ভর। কুবের, কপিলা, মালা, রাসু, আমিনুদ্দী প্রমুখ নিম্নবর্গীয় সবাই এই জীবন নাট্যের কুশীলব। মানিক সচেতনভাবে উপন্যাসে নিম্নশ্রেণীর মানুষের জীবনবোধকে উপন্যাসে স্থান দিয়েছেন। ‘ঈশ্বর থাকেন ঐ ভদ্রপল্লীতে’— ঔপন্যাসিক নিজে ভদ্রপল্লীতে বাস করে এ উক্তি করছেন। বুদ্ধি ও চিন্তার সারবত্তা দিয়ে নিম্নবর্গের ব্যক্তিজীবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছেন।
প্রাগৈতিহাসিক গল্পের ভিখু নিম্নবর্গেরও নিম্নতর, এই গল্পের মাধ্যমে ভারতবর্ষীয় শ্রেণীসংঘাত নয় বরং ব্যক্তিমানুষের বৈকল্য ও স্বাভাবিকতার দ্বন্দ্বকে উন্মোচন করতে চেয়েছেন। ফ্রয়েডীয় মনোসমীক্ষণকে সাহিত্যে অবলোকন বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে অত সহজ ছিল না। একথা নিঃসংশয়ে বলা যায়, মানিকের প্রায় সকল সৃষ্টি বিশ্বমানের। ভিখুর লালসা ও কামনাকে অঙ্কন গড় কথাকারের পক্ষে সম্ভব নয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভিখুর অন্তর্লোকে প্রবেশ করে দেখেছেন মানবমনের চাওয়া ও বৈচিত্র্য-অভিসারী গন্তব্যকে। সে কারণে প্রবাদসম উক্তি করেছেন: ‘পায়েনি তুই ব্যথা পাস পাঁচী’। এক ভয়ঙ্কর ডাকাতও খুনের মাধ্যমে লুট করা প্রেমিকার প্রতি দরদি ও মানবিক হয়ে উঠতে পারে। মানুষের মনের অতল গহ্বরে ডুব দিয়ে ফ্রয়েডের তত্ত্বের উত্কৃষ্ট প্রয়োগ দেখিয়েছেন সাহিত্যে। মন বর্ণনা করতে গিয়ে প্রায়ই স্মরণীয় সব চরণের অবতারণা করেছেন, যা একাধারে কাব্যিকতায় মোহমুগ্ধকর। প্রাগৈতিহাসিক গল্পের শেষ লাইনে মানবজীবনের অবচেতন মনের দার্শনিক সত্যকে উদ্ভাসিত করেছেন: ‘কিন্তু যে ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্রহ করিয়া দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচী পৃথিবীতে আসিয়াছিল এবং যে অন্ধকার তাহারা সন্তানের মাংসল আবেষ্টনীর মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক, পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই, কোনোদিন পাইবেও না।’ কেবল সামষ্টিক সমাজ বা শ্রেণী চেতনা নয়, ব্যক্তির গহিন অন্ধকারেও মানিক ডুব দিয়েছেন অসংখ্যবার। কথাকার মানিকের এ আরো একটি সফলতা। জনপ্রিয় পুতুল নাচের ইতিকথায় শশী-কুসুম সম্পর্ককে শারীরবৃত্তীয় জটিলতা থেকে ঊর্ধ্বে নিয়ে দেখিয়েছেন, মন মানুষের জটিলতার কেন্দ্র, শরীর কেবল বাহ্যিক আবরণ। কুসুমের অনুবেদনে উঠে আসে যে মানুষ শেষ পর্যন্ত মনের বৈচিত্র্য অন্বেষণের নিকট পরাজিত: ‘স্পষ্ট করে ডাকা দূরে থাক, ইশারা করে ডাকলে ছুটে যেতাম তখন। আজ হাত ধরে টানলেও আমি যাব না। কেন যাব? লাল টকটক করে তাতানো লোহা ফেলে রাখলে তাও আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে যায়, যায় না? সব ভোঁতা হয়ে গেছে ছোটবাবু। লোকের মুখে মন ভেঙে যাবার কথা শুনতাম; অ্যাদ্দিনে বুঝতে পেরেছি, সেটা কী।’ দেবদাস-পার্বতীর পাঠক যখন শরত্চন্দ্রের চরিত্রদের অনুকথনে-অনুবর্তনে ক্লান্ত তখনই জীবনকে দেখার বৈজ্ঞানিক নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হাজির হলেন। তাই তার শশী ইচ্ছে করলেও নিজের ভুবন ও বৃত্ত ভাঙতে পারে না।
আমাদের মধ্যে একটি সাধারণ বিশ্বাস জন্মেছে যে, সাহিত্যের যেকোনো প্রবণতা প্রথমে পশ্চিমে জনপ্রিয়তা পাবে। তার পর প্রশান্ত মহাসাগর ও অতলান্তিকের ঢেউ পেরিয়ে ভারতবর্ষে দারুণ ফেনিল গর্ব নিয়ে আছড়ে পড়বে। এই ধারাবাহিকতায় আধুনিক সাহিত্য বিশেষ করে কবিতা-উপন্যাসের যেকোনো প্রবণতাকে ধরে নেয়া হয়, পশ্চিমের পর পূর্বে তথা উপনিবেশিত অঞ্চলে জনপ্রিয়তা পাবে। এই অভ্যাসবশত আলব্যের কামু দ্বারা প্রভাবিত মানিক— এমন একটি মিথ চালু হয়েছিল। কিন্তু মানিকের শশী কামুর রিও-এর পূর্বজ, তদ্রুপ গাওদিয়ার সংকট ওরানের চেয়ে আগের, মূলত মানিকই পথিকৃত্। পুতুল নাচের ইতিকথা আলব্যের কামুর উপন্যাসগুলোর পূর্বে লিখিত। অনুকরণের যে রীতি ও এই রীতির ফলে সমালোচকদের পূর্বানুমানের রীতি বাঙালিরা চালু করেছিল— তা মানিকের বেলায় খাটে না। মানিক ইউরোপকে কখনই অন্ধ অনুকরণ করেননি। তার সাহিত্য বিশ্লেষণ করতে গেলে হয়তো অস্তিত্ববাদ, মার্ক্সবাদ, সাইকো-অ্যানালাইসিস প্রভৃতি প্রপঞ্চকে ডেকে আনতে হয় বটে, তবু মানিক স্বনির্ভর, মৌলিক, আপন শক্তিতে জ্বলছেন। এর কারণ মানুষের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। কেন লিখি এই প্রশ্নের জবাবে তাঁর স্পষ্ট উত্তর: লেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায়েই যেসব কথা জানানো যায় না, সেই কথাগুলো জানাবার জন্যই আমি লিখি। সাহিত্যের যে দায় লেখককে ফুল-নদী-পাখি থেকে বিমুখ করে মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, মানিক তার সবটাই পূর্ণ করেছেন কথার বয়নে।
মানিক তাই বিবরণধর্মী কথাকারদের বিপরীতে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছেন। জীবনকে যে সরল মুকুর ছাড়াও দেখা যায়, অসংখ্য অবতল-উত্তল দৃক ছাড়াও অবচেতনের আরেক দুনিয়ার মাধ্যমে চরিত্রেরা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে, মানিকের মতো এত স্পষ্ট করে আর কেউ অঙ্কন করেননি। ক্রমাগত ভার্চুয়াল সার্ফিংয়ের জগতে পাঠকেরা যখন সাহিত্যের অসংখ্য বিকল্পের মধ্যে হাতড়ে বেড়ান জীবনের প্রতীতি, তখনই ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানোর অজুহাতে হলেও ঠিকই স্মরণ করতে হয় মানিক-নক্ষত্রকে। এই নক্ষত্র আমাদের আলোকিত করে যাচ্ছে শতাব্দী পেরিয়ে।

বহির্জীবন ও অন্তর্জীবনের কথাকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি
অ লা ত   এ হ সা ন 


গত শতাব্দীর ত্রিশ ও চল্লিশের দশক বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন, সাহিত্যের ইতিহাসেও তেমনি ঘটনাবহুল ও অবিস্মরণীয় কাল। বাংলা সাহিত্যের জন্যও এ কথা সমভাবে সত্য। এ সময় বাংলা কবিতায় যেমন আধুনিক ধারা সূচিত হয়, একইসঙ্গে বাংলা কথাসাহিত্যে ইস্পিত আধুনিকতা আবির্ভূত হয় এ সময়েই। তবে কবিতার অনুবাদ সংশ্লিষ্ট বা নির্ভর আধুনিকতার তুলনায় কথাসাহিত্য অনেক বেশি স্বায়ম্বর ও প্রাচুর্যময় ছিল। আসলে একইসঙ্গে এতগুলো কর্মচঞ্চল ও শক্তিশালী বিশ্বমানের লেখক-কবির উপস্থিতি বিশ্বের ইতিহাসেই বিরল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিশ্বস্বীকৃত ও বিপুল কর্মরাজীর মহাপুরুষ সচল থাকার পরও এ সময় রবীন্দ্র-উত্তর আধুনিকতা বিস্তার লাভ করে। কথাসাহিত্যে রবীন্দ্র-উত্তর আধুনিকতা, বিশেষত তাঁর ভাব নির্ভরতার বিপরীতে মানুষের বহির্জীবন ও অন্তর্জীবনের বৈচিত্র্য এবং সংগ্রামকে যিনি সবচেয়ে সফলভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। 

মাত্র আটচল্লিশ বছরের সংক্ষিপ্ত আয়ুষ্কালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সাঁইত্রিশটি উপন্যাস, দুই শতাধিক গল্প, কিছু প্রবন্ধ রচনা করেছেন যা কিনা বিশ্বের যে কোনো কর্মবহুল লেখকের সমৃদ্ধ সম্ভার স্মরণ করিয়ে দেয়। তাছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর শতাধিক সম্পূর্ণ-অসম্পূর্ণ কবিতা ও খসড়া পাওয়া যায়। অবশ্য এগুলো তাঁর যুবক বয়সেই (১৬ থেকে ২১ বছর) রচিত। মৃত্যুর পরও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনেক অপ্রকাশিত সাহিত্য পাওয়া গেছে। তাছাড়া তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পত্রিকায় লিখতেন। যদিও লেখাগুলো পরে আর সংগ্রহ করা যায়নি।   



জীবনঘনিষ্ট এই কথাশিল্পীর জন্ম ১৯০৮ সালের ১৯ মে, বাংলা ১৩১৫’র ৬ জৈষ্ঠ্য। পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মস্থল ভারতের সাঁওতাল পরগণার দুমকা শহরে তাঁর জন্ম। তাঁদের পৈত্রিক নিবাস ছিল ঢাকার বিক্রমপুর জেলার (তৎকালীন মহকুমা) মালদপিয়া গ্রামে। ’৪৭-র দেশভাগের সময় তাঁদের সবাই দেশ ত্যাগ করেন। প্রয়াত কথাশিল্পী কায়েস আহমেদের ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈত্রিক ভিটে ও মালদপিয়ার রমণী মুখুজ্জে’ পড়লে বোঝা যায় তাঁরা কেন দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। 


মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যের সূচনা বিচারে এ তথ্য সত্য যে, কলেজে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে তিনি প্রথম গল্প ‘অতসীমামী’ লিখেন। তবে খানিকটা আকস্মিক হলেও তা মোটেই সাধারণ ছিল না। প্রথম গল্পগ্রন্থভুক্ত ‘মহাসংগম’ গল্পটি সম্পর্কে অধ্যাপক নির্মাল্য আচার্য বলেন, ‘এর তুল্য গল্প বিশ্বসাহিত্যে কদাচিৎ মিলবে।’ প্রথম গল্প প্রকাশের সময় তিনি তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক ‘প্রবোধকুমার’ নামের স্থলে ডাক নাম ‘মানিক’ ব্যবহার করেন। ১৯৩৪ সালে ‘বঙ্গশ্রী’ সাহিত্য পত্রিকায় ‘দিবারাত্রীর কাব্য’ উপন্যাসটির ধারাবাহিক প্রকাশের মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। পরের বছর ‘পূর্ব্বাশা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসটি। ১৯৩৫ সালে ‘জননী’, ‘দিবারাত্রীর কাব্য’ উপন্যাস এবং ‘অতসীমামী ও অন্যান্য গল্প’ গল্পগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর গ্রন্থকার হিসেবে যাত্রা শুরু হয়। 


প্রথম উপন্যাসেই মানিক অভিনবত্বের সূচনা করেন। তাঁর সাহিত্য সমসাময়িক ইতিহাস ও সমাজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। সমাজের তল খুঁজতে গিয়ে, মানুষের প্রতি অধিকতর দায়বদ্ধতা থেকে তিনি অবধারিতভাবেই রাজনীতিতে জড়িয়েছিলেন। সে রাজনীতি মানবমুক্তি-সমাজ প্রগতির রাজনীতি। তাই বলে তার সাহিত্য মান কমে গেছে, নিন্দুকের এমন প্রচার সত্য নয়। বরং তাঁর লেখনি এতটা উর্বর ছিল যে, সমসাময়িক বিষয়ের প্রতি সাবলীল সাড়া দিতে পেরেছেন। পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর সাহিত্যে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষাতত্ত্ব ও মার্ক্সীয় বিশ্ববীক্ষাযুক্ত সফলভাবে যুক্ত হয়েছে। সাহিত্যে উঠে এসেছে সেই সব মানুষের জীবন ও সংগ্রাম। 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখক হিসেবে, সাহিত্যে সৎ থেকেই কমিউনিজমে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে তিনি ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’-এ যুক্ত হন। ’৪৪ এর শেষের দিকে যুক্ত হন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে। যুগপৎ লেখক ও রাজনীতিক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। তিনি পরবর্তীতে ‘প্রগতি লেখক সংঘ’র সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। মূলত শ্রমিক ধর্মঘটের প্রেক্ষাপটে দুই খণ্ডে রচিত ‘শহরতলী’ উপন্যাসটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী বুদ্ধিজীবী মহলে তাঁর সাড়া পড়ে। দাঙ্গার পটভূমিতে কলকাতার বেহাল নগরজীবন নিয়ে রচিত হয় তাঁর প্রখ্যাত রাজনৈতিক উপন্যাস ‘স্বাধীনতার স্বাদ।’ বাঙালি সমাজের হতাশা, গ্রামীণ জীবনের অবহেলা, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অসারতা নিয়ে লেখেন শ্লেষাত্মক উপন্যাস ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’। 

‘পদ্মনদীর মাঝি’তে লেখকের শব্দচয়ন, উপমা ও ভাষাশৈলীর কারণে বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিক উপন্যাসের মর্য়াদা পেয়েছে। ‘ভিটেমাটি’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাটক। যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা বিদ্ধস্ত অবস্থা নিয়ে রচিত তাঁর ‘আজ কাল পরশুর গল্প’ গল্পগ্রন্থটি বিপ্লবী চেতনার অনন্য দলিল। কোনো কোনো গল্পে তাঁর জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতা ও মানসের সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর অনেক উপন্যাস, গল্পই পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর জীবদ্দশাতেই ১৯৪৮ সালে ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র তৈরি হয়।


বিএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় এবং লেখক হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কারণে পরিবারের সঙ্গে তাঁর বেশ দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। ফলে দ্রুতই তাঁকে পেশাজীবন বেছে নিতে হয়ে। ১৯৩৫ সালে ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকায় সম্পাদকীয় পদে পাঁচ বছর যুক্ত থাকেন। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেটা ছেড়ে দিয়ে পরে ভাইয়ের সঙ্গে প্রকাশনা ব্যবসা শুরু করেছিলেন। আড়াই বছরের মাথায় তা গুটাতে হয়। পরবর্তীতে স্বল্পকালীন নানা পেশায় যুক্ত হলেও কোনোটাই স্থায়ী হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই কলকাতায় জীবন ধারণ কষ্টকর ছিল। শুধুমাত্র লেখালেখির উপর ভর করে সংসার চালানো সম্ভব ছিল না। তাই অর্থ সংস্থানের জন্য তাঁকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। তাছাড়া দেশের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পার্টির প্রচুর কাজও করতে হতো। ফলে তাঁর শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। এক পর্যায় ডাক্তারের পরামর্শে তাঁকে বিয়ে করতে হয়। তবে আর্থিক সংকট তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পোহাতে হয়েছে। বলা যায়, চিকিৎসার অভাবেই তাঁর মৃত্যু হয়। এমনকি মৃত্যুর খবর তাঁর পার্টির কমরেড ও লেখকদের জানানোর মতোও তখন অবস্থা ছিল না। ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর, বাংলা ১৭ অগ্রহায়ণ, ১৩৬৩, সোমবার ভোরে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর সুভাষ মুখোপাধ্যায় খবরটি জানতে পারেন। তিনি মানিকের স্ত্রী কমলা(ডলি)-র কাছে জানতে চান, তাকে কেন ফোন করে আগে জানানো হয়নি? তিনি উত্তর দেন, ‘তাতেও যে পাঁচ আনা লাগাতো দাদা।’

‘লেখকের কথা ও প্রগতি সাহিত্যের আত্মকথা’ শীর্ষক তাঁর প্রবন্ধ সংকলন, যা অধিকাংশই আত্মজৈবনিক ভাষায় লেখা, বাংলা সাহিত্যের লেখকের আত্মসমালোচনার ধারা সূচনা করেছে। বোধ করি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই নিজের লেখনী শক্তি ও আত্মচিহ্ন সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘মিহি ও মোটা কাহিনী’র এক বিজ্ঞাপনে যেমন নিজেই লিখেছিলেন, ‘...কালচার নামক ব্যারামটি এ শ্রেণীর মানুষের জীবনের আনন্দ-বেদনার উপর যে কৃত্রিম যবনিকা টানিয়ে দেয় সমাজের সকল স্তরের সকল শ্রেণীর মানুষের জীবন হইতে মানিকবাবু তাঁহার রসসৃষ্টির উপাদান সংগ্রহ করেন। এই সকল মানুষের বহির্জীবন ও অন্তর্জীবনের বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে মানিকবাবুর লেখায় যে রস সৃষ্টি হইয়াছে তাহার তুলনা নাই।’


লেখক : গল্পকার

২টি মন্তব্য: